রাজ্য

অচেনা অগ্নিকন্যা

পলাশ মুখোপাধ্যায়ঃ তিনি অগ্নিকন্যা, তিনি সততার প্রতীক, তিনি বাংলার নিজের মেয়ে। তার লড়াকু ইমেজ, অনমনীয় তেজ, হারা না মানা যুদ্ধের উদাহরণ গোটা দেশে ফেরে। তার জ্বালাময়ী ভাষণে উৎসাহিত হয় কাকদ্বীপ থেকে কালিম্পং। কিন্তু ভবানীপুরের ভোট প্রচারে এবার যেন সেই চেনা মমতার দেখা মিলল না। “একটা ভোটও নষ্ট করা চলবে না, আমাকে ভোট না দিলে অন্য কেউ মুখ্যমন্ত্রী হবেন”। ভোট চাওয়ার এমন আকুতি আগে তো দেখিনি। মুখ্যমন্ত্রী থাকার জন্য এই আর্তিও অনেকটাই অচেনা। নবীন অবস্থায় সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মত দুঁদে রাজনীতিবিদকে যিনি অনায়াসে হারিয়েছেন, একটা সময় যখন লোকসভায় তৃণমূলের একমাত্র সলতে ছিলেন। সেইখান থেকে আজ শাসক দলের প্রধান। লম্বা লড়াইয়ে কখনও তাকে এই ভাষায় ভোট চাইতে দেখিনি।

শেষ বিধানসভা নির্বাচনে বাংলা নিজের মেয়ের দলকে চাইলেও মেয়েকে চায়নি। তাই কি কোনও ভয়, আশঙ্কার কুয়াশা ভবানীপুরের আনাচে কানাচে! আসলে শুভেন্দু অধিকারী যত হেভিওয়েটই হোন না কেন তিনি যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে দেবেন, এটা স্বপ্নেও ভাবেননি মমতা নিজে বা তৃণমূলে তার মোসায়েবরা। ব্যবধান কম বেশি নিয়ে আলোচনা হলেও মমতার জয় নিয়ে সংশয় ছিল না কারও। রাজ্য জুড়ে তৃণমূলের ব্যপক জয়েও কিন্তু এই হারই গলার কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে এখনও। তাই তো মমতাও আর নিজের ঘর ছেড়ে বেরতে চাননি। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কেও জেতা আসন ছেড়ে দিতে হল শুধু ঘরের মেয়েকে নিজের আসন দেওয়ার জন্য। মমতা কিন্তু সহজেই খড়দা থেকে দাঁড়াতে পারতেন। কিন্তু সেই ঝুঁকি তিনি নিতে চাননি। খড়দা আসনটিও কিন্তু মাঝে মধ্যেই বদল ঘটায়। কি দরকার ঝুঁকি নিয়ে।

সে হতেই পারে, তৃণমূলের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার বা থাকার এই যে প্রকাশ্য আকুতি তা আমাদের চেনা তৃণমূল নেত্রীকে অনেকটাই অচেনা করে তুলেছে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী যদি না হন, তাহলেও যে সংখ্যা গরিষ্ঠতা তৃণমূলের আছে তাতে তারা সরকারে সহজেই থাকবে। তৃণমূলের তরফেই কেউ হয়তো মুখ্যমন্ত্রী হবেন। তৃণমূল সুপ্রিমো হিসেবে মমতা তখনও শাসনই করতে পারবেন পরোক্ষ ভাবে। যেমনটা এর আগে অনীল বিশ্বাস, বিমান বসুরা করে গিয়েছেন। কিন্তু বছর দশেকের অভ্যেস, ক্ষমতার শীর্ষে থাকার সুখ, সর্বময় কর্তৃত্বের তৃপ্তি, মুখ্যমন্ত্রী চেয়ারটা ছেড়ে দিতে তাকে বড়ই কষ্ট দিচ্ছে। তাই বোধহয় এমন আকুতি।

তাঁর মতে এনআরসির বিরুদ্ধে লড়াই, বিজেপির নানান জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, দাঙ্গা হাঙ্গামার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর মুখ্যমন্ত্রী থাকা প্রয়োজন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী না থাকলে কি এই সব সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই সম্ভব নয়? বরং তিনি তো জাতীয় স্তরে আরও বেশি করে সময় দিতে পারতেন। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইয়ের ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করতে পারতেন। কিন্তু না, তিনি এখন সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ডরাচ্ছেন মনে হয়। ভবানীপুরে তাঁর জয় নিয়ে খুব একটা সংশয় কিন্তু নেই। আশা করা যায় তিনি সহজেই জিতবেন। বিপক্ষে প্রার্থীও খুব একটা হেভিওয়েট বলা যায় না, শুভেন্দুর মত তো নয়ই। তা স্বত্বেও কিন্তু প্রচারে সামান্যতম ঢিলে দিচ্ছেন না তিনি।

এবার চেষ্টা করি এই আকুতির কারন অনুসন্ধানে। আসলে তিনি না থাকলে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন? সেটা সত্যিই একটা চাপের বিষয়। অভিষেককে বসাতে গেলে আবার তাকে অন্য কোনও জায়গা থেকে জিতিয়ে আনতে হবে, এছাড়াও তিনি এখনই এতটা চাপ নিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অন্য কাউকে ওই পদে বসালে ভিতরে ভিতরে একটা অন্তর্দ্বন্দ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এমনিতেই তৃণমূল দলে অন্তর্কলহ ভাইরাল ফিভারের মত, মাঝে মধ্যেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। নেত্রীর সিদ্ধান্তে মুখে কেউ কিছু না বললেও মন থেকে মেনে না নেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। তাই দল চালাতে গেলে তাকেই মুখ্যমন্ত্রী থাকতে হবে, না হলে সমস্যা আছে। এটা মমতা ভাল মতই জানেন, তাই তিনি মুখ্যমন্ত্রীত্বে থাকার এই সুযোগটিকে এমন আবেগঘন ভাবে ব্যবহার করছেন। এখন ঘরের মেয়ের এমন আকুতি, আবদারের প্রত্যুত্তর ভবানীপুর কিভাবে দেয় সেটাই দেখার। আমরা কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেই চেনা, লড়াকু অগ্নিকন্যা হিসেবেই দেখতে চাই, সে তিনি মুখ্যমন্ত্রী থাকুন বা না থাকুন।